ছবি : প্রতিদিনের কক্সবাজার
কক্সবাজার আইকনিক রেল স্টেশনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক ও কর্মচারী দলের ব্যানার ভাঙচুর, নেতাকর্মীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা, মারধর এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কক্সবাজার রেল স্টেশনর আরএমবি ইনচার্জ ইন্সপেক্টর আমিনুল হক রাব্বানী এবং বুকিং সহকারী ইব্রাত হোসেনের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এই ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটেছে বলে জানা গেছে।
গত মঙ্গলবার (২৫ মে) দিবাগত রাত ৪টার দিকে আইকনিক রেল স্টেশনের দক্ষিণ পাশে এই ঘটনা ঘটে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রেলওয়ে শ্রমিক ও সাধারণ কর্মচারীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, কক্সবাজার রেল স্টেশনের আরএমবি ইনচার্জ আমিনুল হক রাব্বানী এবং বুকিং সহকারী ইব্রাত হোসেন দীর্ঘদিন ধরে স্টেশনে নিজেদের একক আধিপত্য বজায় রেখেছেন। সম্প্রতি তারা ‘বিআরএল’ নামে রেলওয়ের একটি বিশেষ সংগঠনের পক্ষ থেকে বড় অঙ্কের একটি অনৈতিক আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করে। এবং এই সুবিধার বিনিময়ে তারা স্টেশনে জাতীয়তাবাদী আদর্শের কোনো কার্যক্রম বা ব্যানার প্রদর্শন না করার নিশ্চয়তা দেন।
জানা গেছে, মঙ্গলবার ২৫ তারিখ শেষ রাতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক ও কর্মচারী দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ রেল স্টেশনের দক্ষিণ পাশে সংগঠনের একটি বড় ঈদ শুভেচ্ছা ব্যানার টাঙাতে যান, তখন রাব্বানী ও ইব্রাতের নেতৃত্বে একদল উগ্রপন্থী তাদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা ব্যানারটি ছিঁড়ে ফেলে এবং লাথি মেরে কাঠামোটি ভেঙে চুরমার করে দেয়। এ সময় বাধা দিতে গেলে শ্রমিক দলের নেতাকর্মীদের বেদম মারধর করা হয়,ঘটনাস্থলে ২ থেকে ৩ জন সদস্য গুরুতর আহত হয়। হামলাকারীরা প্রকাশ্যে ভাবে শ্রমিক দলের সদস্যদের ভবিষ্যতে ব্যানার টাঙালে চাকরি থেকে বহিস্কার ও মারধরের হুমকি প্রদান করে।
নেতাকর্মীরা জানান, ভাঙচুর করা ওই ব্যানারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ স্থানীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের ছবি ছিল। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান,স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ,রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী রবিউল ইসলাম,রেলওয়ে প্রতিমন্ত্রী হারুনুর রশিদ,
কক্সবাজার সদর আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর
রহমান কাজল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক ও কর্মচারী দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুমিনুল ইসলাম মামুন এবং সাধারণ সম্পাদক পিয়ারুল ইসলাম জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক ও কর্মচারী দল কক্সবাজার শাখার আহ্বায়ক শুভংকর দে এবং সদস্য সচিব আমান উল্লাহসহ একাধিক স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিকের ছবি ছিল।
শীর্ষ নেতৃবৃন্দের ছবি সম্বলিত এই ব্যানার ভাঙচুরের ঘটনাকে পুরো জাতীয়তাবাদী পরিবারের ওপর বড় আঘাত ও অবমাননা হিসেবে দেখছেন তৃণমূলের কর্মীরা।
স্টেশনের একাধিক সূত্র থেকে অভিযোগ উঠেছে, রাব্বানী এবং ইব্রাত হোসেন দৃশ্যত সরকারি কর্মচারী হলেও তারা ভেতরে ভেতরে চরম উগ্র ও জামায়াতপন্থী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। তারা অত্যন্ত সুকৌশলে ও পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক ও কর্মচারী দলের সদস্যদের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছেন এবং প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার বানাচ্ছেন।
শ্রমিক দলের একজন ভুক্তভোগী সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়ন করা আমাদের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু রাব্বানী ও ইব্রাত হোসেন আমাদের সেই মৌলিক অধিকার হরণ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। আমরা রেলের বিভিন্ন বিভাগে বৈধ কর্মচারী হিসেবে কাজ করা সত্ত্বেও তারা আমাদের চরম হেয় প্রতিপন্ন করে বলেন— ‘তোরা ঝাড়ুদার, তোরা ক্লিনার; তোদের কোনো রাজনীতি করার অধিকার নেই।’ এটি চরম বৈষম্যমূলক এবং বিগত ফ্যাসিবাদের আচরণের হুবহু প্রতিফলন।”
অভিযুক্ত ইন্সপেক্টর আমিনুল হক রাব্বানীর বিরুদ্ধে শুধু শ্রমিক হেনস্তাই নয়, বরং টিকিট কালোবাজারির সাথে যুক্ত থাকারও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, গত ২৪ মে সকাল ১১টার দিকে কক্সবাজার স্টেশনে সরকারি মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে কালোবাজারির টিকিট বিক্রি করার সময় এক সাধারণ যাত্রী এর প্রতিবাদ করেন। ওই সময় ইন্সপেক্টর রাব্বানী নিজেই ওই যাত্রীর ওপর চড়াও হন। তাদের মধ্যে তীব্র ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে এবং রাব্বানীর শারীরিক নির্যাতনের কারণে ওই সাধারণ যাত্রী স্টেশনেই আহত হন। এই ঘটনাটি নিয়েও রেলওয়ে ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে অভিযুক্ত বুকিং সহকারী ইব্রাত হোসেনের বিরুদ্ধে গত কয়েক মাস আগে টিকিট কালোবাজারীর অপরাধে কক্সবাজার থেকে হাসানপুর ফেনী রেলওয়ে ষ্টেশনে বদলী হয়। কিন্তু সে সপ্তাহে দুইদিন করে কক্সবাজারে এসে পরিকল্পিতভাবে জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক ও কর্মচারী দলের সংগঠনকে নির্মূল করার জন্য চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক ও কর্মচারী দল, কক্সবাজার শাখার আহ্বায়ক, শুভংকর দে বলেন,
আমরা শ্রমিক আমাদের থেকে কক্সবাজার রেল ষ্টেশনের ইন্সপেক্টর রাব্বানী এবা বুকিং সহকারী ইব্রাত প্রতিনিয়ত চাঁদাদাবী করে আসছিলেন, আমরা চাঁদা না দেওয়াই আমাদের ব্যানার ন্যক্কারজনক ভাবে ভেঙ্গে পেলেন। আমরা রেলওয়ের সাধারণ শ্রমিকদের আপদ-বিপদ ও অধিকার আদায়ের যৌক্তিক লড়াইয়ের জন্য এই সংগঠন করেছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে দেখছি, বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের কায়দায় আমাদের শ্রমিকের ব্যানার লাথি দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে। কক্সবাজার আরএমবি ইন্সপেক্টর রাব্বানী এবং বুকিং সহকারী ইব্রাত হোসেনের সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ শ্রমিকরা আজ তাদের ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে না। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং এদের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।”
জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক ও কর্মচারী দল, কক্সবাজার শাখার সদস্য সচিব, আমান উল্লাহ বলেন, আমরা চাঁদা না দেওয়ায় ২৫ তারিখের শেষ রাতে রাব্বানী এবং ইব্রাত হোসেন যে ন্যক্কারজনক ও কাপুরুষোচিত ঘটনাটি ঘটিয়েছে, তা শুধু আমাদের সাধারণ শ্রমিক ভাইদের অপমান করেনি, বরং এটি পুরো জাতীয়তাবাদী পরিবারের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করেছে। আমরা এই ফ্যাসিবাদী আচরণের তীব্র ধিক্কার জানাই এবং অবিলম্বে এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”
এবিষয়ে কক্সবাজার রেল স্টেশনের প্রধান/স্টেশন মাস্টার, জয়নাল উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, স্টেশন প্রাঙ্গণে শ্রমিকদের ব্যানার ভেঙে ফেলার বিষয়টি অত্যন্ত অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব। ভুক্তভোগী বা সংগঠনের পক্ষ থেকে কেউ যদি আমার কাছে এই বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন, তবে আমি বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করব।”
ঘটনার বিষয়ে মূল অভিযুক্ত কক্সবাজার রেল ষ্টেশনের ইন্সপেক্টর আমিনুল হক রাব্বানীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যানার সরানোর কথা স্বীকার করেন। তবে মারধর ও হুমকির বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, “আমার নিরাপত্তার দায়িত্ব থেকে (স্টেশনের নিরাপত্তা জনিত কারণে) ব্যানারটি ভেঙে বা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
অন্যদিকে, ঘটনার অপর মূল হোতা এবং অভিযুক্ত বুকিং সহকারী ইব্রাত হোসেন-এর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সংযোগটি পাওয়া যায়নি (মোবাইল ফোন বন্ধ/অপ্রাপ্য পাওয়া যায়)।
কক্সবাজার স্টেশনের এই নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা ও ব্যানার ভাঙচুরের বিষয়ে রেলওয়ে চট্টগ্রামের চীফ কমান্ড্যান্ট (সিআরবি) জহিরুল ইসলাম-এর সাথে যোগাযোগ করার একাধিক বার চেষ্টা করা হলেও তিনি মোবাইল রিসিভ করেননি।