ছবি : প্রতিদিনের কক্সবাজার
কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার বারবাকিয়া ইউনিয়নের ফাঁসিয়াখালী ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা ১৯৬৮ইংরেজীতে প্রতিষ্ঠিত হয়। গত ২০১৭ ইংরেজী থেকে কামিল স্বীকৃতি লাভ করে। দীর্ঘ দেড়যুগ ধরে ধরে উক্ত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ ও আর্থিক অনিয়মে নিমজ্জত হয়ে পড়েছে অভিযোগ উঠেছে।
প্রাপ্ত তথ্যে সূত্রে জানা গেছে, বিগত ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি পদ না থাকা সত্বেও শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান সহকারী মৌলভী নুরুল আবছার এবতেদায়ী প্রধান পদে নিয়োগ প্রাপ্ত হওয়ার সময় উক্ত পদে তিনি এমপিওভুক্ত হতে পারেননি। প্রায় ২বছর পরে মাদরাসা অধিদপ্তরের দুর্নীতিবাজ কতিপয় কর্মকর্তাদের সহযোগীতায় অনিয়মের মাধ্যমে উক্ত পদে এমপিওভুক্ত হন। এমনকি উক্ত সহকারী মৌলভী পদটি এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের নিকট চাহিদা দেওয়ার সময় নন এমিপও পদ হিসেবে দেখাওনা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক নুরুল আবছারকে ফোন করা হলে তিনি তার নিয়োগের ব্যাপারে যাবতীয় অভিযোগ অসত্য বলে দাবী করেন এবং একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ মাদরাসার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে বলে জানান।
এ ব্যাপারে তখনকার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জনাব আবুল মনছুর এর নিকট জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান সব ধরণের পাসওয়ার্ড তখনকার ইবি প্রধান নুরুল আবছারের কাছে ছিল। তবে আমি সেই রকম একটি অভিযোগ কয়েকজন প্রার্থীর কাছ থেকে শুনেছি। তখন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জানা যায়, মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক (বিপিএড) নুরুন্নবীর নিয়োগের ক্ষেত্রেও কমিটি ও নুরুন্নবীর যোগসাজোসে তার পছন্দনীয় প্রার্থী ছাড়া আর কাউকে ইন্টাভিউ কার্ড না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। উক্ত বিষয় নিয়ে তখনকার সময় সোস্যাল মিডিয়া ও স্থানীয় পত্রিকায় লেখালেখি হয়েছিল। অনুরূপভাবে বর্তমান উপাধ্যক্ষ আবুল মনছুর ও অধ্যক্ষ জনাব মুহাম্মদ আক্কাছ এর নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। উপাধ্যক্ষ নিয়োগের সময় সর্বাধিক নম্বর প্রাপ্ত প্রার্থীকে নিয়োগ না দিয়ে আবুল মনছুরকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আর অধ্যক্ষ নিয়োগের সময় দুইজন গুরুত্বপুর্ণ প্রার্থীকে ইন্টারভিউ কার্ড না দিয়ে তাদেরকে নিয়োগ পরীক্ষায় আসতে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং লিখিত পরীক্ষায় আরেজন প্রার্থী অধিক নম্বর পাওয়ার পরও বর্তমান অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আক্কাছকে ভাইভা পরীক্ষায় অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছিল। বর্তমান অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালে এনটিআরসিএ এর নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের যাবতীয় সনদ যাচাই বাছাই করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিধান থাকলেও নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে কয়েকদিনের মধ্যে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অভিযোগ রয়েছে।
নাম না জানার শর্তে মাদ্রাসার একজন প্রভাষক জানান, নিয়োগ প্রাপ্ত শিক্ষকদের মধ্যে দুইজন শিক্ষকের সনদ জালিয়তি ও বর্তমান অধ্যক্ষের তদবিরের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানে পোস্টিং হওয়া অভিযোগ থাকার কারণে, এদের নিয়োগের ব্যাপারে এভাবে তাড়াহুড়া করা হয়েছে। উক্ত প্রভাষক এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে সুষ্ঠু তদন্ত দাবী করেন।
মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আক্কাছ এর কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, আমার নিয়োগের ব্যপারে কোন ধরণের অনিয়ম হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। তিনি আরো জানান এনটিআরসিএ এর নিরয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ব্যাপারে কোন লিখিত অভিযোগ আমি পাইনি। আর আমার নিয়োগের পূর্বে নিয়োগ প্রাপ্ত শিক্ষকদের কোন ডকুমেন্ট মাদরাসায় নেই। এমনকি ২০১৭ সালের আগে গভর্নিং বডির সিদ্ধান্তের কোন রেজুলেশনবুক মাদরাসায় সংরক্ষিত নাই। এ ব্যাপারে থানায় জিডি করা হয়েছে। উক্ত বিষয়টি অধ্যক্ষের নিয়োগ সংক্রান্ত যাবতীয় ডকুমেন্ট যাচাই করলে প্রমানিত হবে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে পরিচালনা কমিটির একজন প্রাক্তন সদস্য জানান, বর্তমান পরিচালনা কমিটির সভাপতি জনাব মাওলানা বদিউল আলম উক্ত মাদরাসার সভাপতি থাকাকালীন মাদরাসার আর্থিক বিষয়সহ যাবতীয় কার্যাদি স্থানীয় দুইজন শিক্ষকের অধীনে পরিচালিত হতো। তার সময়ের প্রায় ৮বছরের আয় এবং ব্যয়ের হিসাব উধাও হয়ে যাওয়ায় তৎকালীন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এডিসি (জেনারেল) কে ম্যানেজ করে প্রায় দুই কোটি টাকার ব্যয় ভাওচার কোন যাচাই বাছাই ছাড়া এক মিটিংয়ে পাশ করার অভিযোগ রয়েছে। এর পরবর্তীতে অদ্যাবধি একই নিয়মে মাদরাসার যাবতীয় আয় আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রায় দেড়যুগ ধরে মন্ত্রনালয়ের অডিট না হওয়ায় উক্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম বন্ধ হচ্ছে না। বর্তমান কমিটি অধ্যক্ষকে চাপ প্রয়োগ করে যাবতীয় হিসাব দিতে বাধ্য করলেও ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ৮ মাসের হিসাব মাদরাসায় পাওয়া যায়নি।
বর্তমান কমিটির একজন সদস্য জানান, অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আক্কাছের আয় ব্যয়ের অডিট রিপোর্টে অনেক অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। যা পুনরায় অডিট চলমান রয়েছে। এটি সম্পন্ন হলে উনার যাবতীয় অনিয়ম উম্মোচিত হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এছাড়াও বর্তমান অধ্যক্ষ ট্রাভেল এজেন্সির সাথে জড়িত থাকায় ঘন ঘন সৌদি আরবে গমন করায় মাদরাসার পড়ালেখা প্রতিনিয়ত অবনতি হচ্ছে বলে দাবী করেন। তবে অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আক্কাছ দাবি করেছেন, তিনি গত ১৮ মাস ধরে সৌদি আরবে যায়নি।
এ বিষয়ে মাদ্রাসার সভাপতি মাওলানা বদিউল আলম এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অধ্যক্ষ থাকা অবস্থায় নিয়োগ ও অর্থনৈতিক অনিয়মের বিষয়ের অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবী করেন। বর্তমান কমিটি এবং প্রাক্তন ছাত্র পরিষদের কয়েকজন সদস্য উক্ত ঐতিহ্যবাহী মাদরাসার সব ধরণের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের যথাযথ তদন্ত ও অডিট করার জন্য জোর দাবী জানান।