কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে ‘রাজুর স্ত্রী’ পরিচয়ে উঠেছিলেন কুমিল্লার ১৫ বছরের স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন। হোটেলের রেজিস্টারে তার নাম লেখা হয়েছিল ‘তানজু আক্তার’, বয়স উল্লেখ করা হয়েছিল ১৮। গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে হোটেলের ৩০২ নম্বর কক্ষে ওঠেন তিনি। পরদিন ৭ অক্টোবর হোটেল ছেড়ে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হন তাজমিন। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়ার হাতে শে’’ষ হয় তার জীবন।
প্রশ্ন জাগে, কীভাবে এক ১৫ বছরের স্কুলছাত্রী কক্সবাজারে গিয়ে একজন পুরুষের সঙ্গে ‘স্ত্রী’ পরিচয়ে হোটেলে ওঠেন?
ঘটনার সূত্রপাত বাড়ির ভেতরেই। গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে ঝ’গ’’ড়া হলে তাজমিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। প্রথমে যান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে, সেখান থেকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন রাজুর সঙ্গে। রাজু তাকে কক্সবাজারে আসার জন্য বিকাশে ৫০০ টাকা পাঠান। এখানে প্রথম প্রশ্ন ওঠে, একজন স্কুলছাত্রী তিন দিন বাড়ির বাইরে থাকলেও পরিবার কী পদক্ষেপ নিয়েছিল? মা জানিয়েছেন, শেষ কথায় মেয়ে বলেছিল সে বান্ধবীর সঙ্গে আছে, কিন্তু কোন বান্ধবী, কোথায়, তা তিনি স্পষ্ট জানতে পারেননি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজু কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করেন। ফেসবুকে পরিচয়ের আগে ইনস্টাগ্রামেও তাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। নিয়মিত বার্তা আদান-প্রদান ও রিলস পাঠানোর মধ্য দিয়ে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। রাজুর এক সহকর্মীর দাবি, ফেসবুকের মাধ্যমে মাত্র ১৭ দিন আগে তাদের পরিচয় হয়। আরেক ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, প্রায় পাঁচ মাস আগেই পরিচয় হয়েছিল এবং নিয়মিত যোগাযোগ চলছিল।
হোটেলের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কলাতলীর কুটুমবাড়ি-সংলগ্ন সড়কের শেষ মাথার তিনতলা আবাসিক হোটেলের রেজিস্টার অনুযায়ী ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে ‘স্বামী-স্ত্রী’ পরিচয়ে ৩০২ নম্বর কক্ষ ভাড়া হয়।
প্রশ্ন হলো, একজন স্কুলছাত্রীকে ১৮ বছর লিখে ঢুকতে দেওয়ার আগে হোটেল কর্তৃপক্ষ কি কোনো পরিচয়পত্র বা বিবাহের প্রমাণ চেয়েছিল? রাজু নিজে একটি আবাসিক হোটেলের কর্মী, তাই এসব নিয়ম-কানুন তার অজানা থাকার কথা নয়। এক রাত থাকার পর ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা হোটেল ছাড়েন বলে এক কর্মচারী জানিয়েছেন।
ফেরার সময়ের তথ্যেও কিছু খুঁটিনাটি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। ট্রাভেল এজেন্সির আবদুল্লাহর ভাষ্য, ৬ অক্টোবর রাত ৮টার পর তাজমিন ও রাজু একসঙ্গে কাউন্টারে এসে পরদিনের আইকনিক এক্সপ্রেসের টিকিট কাটেন। রাজুর দাবি অনুযায়ী ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টায় তিনি তাজমিনকে বাসে তুলে দেন।
রাজুর দেওয়া তথ্যমতে বাস ভাড়া ছিল ৯০০ টাকা, যা রাজু দিয়ে দেয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত পৌনে ১২টার দিকে তাজমিন কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডে হোটেল নূরজাহানের সামনে বাস থেকে নামেন। তাহলে দুপুরে ছাড়া বাস গভীর রাতে পৌঁছাল কেন, মাঝপথে কোথাও থেমেছিল কি না, কিংবা তাজমিন বাসেই ছিলেন কি না, তা বাসের কাউন্টার, চালক ও সুপারভাইজারের বক্তব্য এবং রুটের ফুটেজ থেকে মিলিয়ে দেখা যায়। আরও একটি প্রশ্ন, এত রাতে একজন কিশোরী একা নেমে কেন অচেনা সিএনজি ভাড়া করলেন, আর তাকে নিতে বাড়ির কেউ আসেননি কেন?
এরপর সিএনজি নিয়ে তাজমিন রেসকোর্স এলাকার বাসার দিকে রওনা হন। রাজুর সহকর্মীর ভাষ্যমতে, সিএনজিতে ওঠার পরও রাজুর সঙ্গে তার ফোনে কথা চলছিল এবং চালকের বিস্তারিত তথ্যও তিনি রাজুকে জানিয়েছিলেন। রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের ফোনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে যায়, এরপর আর যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। এখানে প্রশ্ন, লোকেশন বন্ধ হওয়ার পর রাজু কী করেছিলেন? তিনি কি তাজমিনের পরিবারকে, পুলিশকে বা অন্য কাউকে জানিয়েছিলেন যে মেয়েটি নিখোঁজ? চালকের তথ্য হাতে থাকার পরও কেন কোনো জরুরি সহায়তা চাওয়া হলো না? ঘটনার পর রাজু সহকর্মীর কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আকুতি-মিনতি করেছেন এবং বর্তমানে ছুটিতে আছেন, এটিও তদন্তকারীদের নজরে থাকা উচিত। তবে এসব প্রশ্ন সন্দেহের তালিকা মাত্র, প্রমাণ নয়।
তবু সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে যে সত্য আমাদের নাড়িয়ে দেয়, তা হলো তাজমিনকে একজন ঘা’ত’’ক এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছে। একটি পরিবারের আদরের সন্তান, দুই ছোট ভাইয়ের বোন, মায়ের বুকের ধন আজ আর বেঁচে নেই। তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কক্সবাজার যাত্রা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, কিন্তু কোনো কিছুই তার ওপর সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধকে ন্যায্যতা দিতে পারে না।